আমরা পথশিশু আমাদের বসবাস রাস্তার কুকুরের সাথে!

92

বিপ্লব হাসান : জীবনযুদ্ধে সুবিধা বঞ্চিত। সহজে বললে অবহেলিত,অবাঞ্ছিত। সমাজ থেকে ওরা আজ বহুদূরে তারা সমাজেরই অংশ। অথচ আজ ওরা টোকাই বলে সবার কাছে পরিচিত। তবে কি এরা টোকাই হয়ে জন্ম নিয়েছে? না বরং সমাজের অবহেলার কারণে তারা আজ টোকাই। তাদের নেই লেখা পড়া নেই বাসস্থান। পথশিশুরা তাদের প্রাপ্য সব ধরনের নাগরিক অধিকার থেকে কোনো না কোনোভাবে বঞ্চিত। তারা পায় না কোনো শিক্ষা, পায় না অন্ন বস্ত্র কিংবা বাসস্থানের দেখা। রাস্তায় থেকে রাস্তায় খেয়ে তাদের বেড়ে উঠতে হয়। এদের শিক্ষা বঞ্চনাটা সব থেকে বেশি ভয়াবহ। শুধু পথশিশু হওয়ার কারণেই যেন তাদের ভালো একটা স্কুলে পড়ার অধিকার নেই,বই পাওয়ার অধিকার নেই,নেই স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজনীয় সুবিধা। বর্তমানে সরকার ৪০ হাজারেরও বেশি পথশিশুকে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিলেও এর বাহিরে আরও অনেক পথশিশু রয়েগেছে। যারা আজ রয়েগেছে তারা দিন দিন অন্ধকারের রাজ্যে চলে যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ভূলতা ফ্লাইওভারের নিচে এমন একটি চিত্র দেখা গেছে, কুকুরের সাথে প্লাস্টিকের কাগজ,ছিড়ে কম্বল গায়ে দিয়ে শুইয়ে থাকতে দেখা যায় কয়েকজন পথশিশুকে। জানা যায়, বগুড়া জেলার সোনা তালা উপজেলার কাচারি বাজারের বাবর আলীর তিন সন্তান লিখন(৭) নাহীদ(৯),লাবু(১২)। তাদের বাবা বাবুর আলীর মৃত্যুর পর তাদের মার সাথে নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল আসে। অভাব অনাটনের কারণে তাদের মা গোলাকান্দাইল চৌরাস্তা এলাকায় রেখে চলে যায়। তার পর থেকে তারা জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকার জন্য রাস্তায় রাস্তায় টোকাইয়ের মতো জীবন কাটাচ্ছে। তারা প্রতিদিন কাক ডাকা ভোরে গাউছিয়া মাছের আড়তে মাছ টোকাইয়ে বিক্রি করে। তা দিয়ে কোনো মতো চলছে তাদের তিন ভাইয়ের জীবন সংগ্রাম। আর রাত হলে ভূলতা ফ্লাইওভারের নিচেই প্লাস্টিকের কাগজ,পাটের চট,ছিড়ে কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে জানতে চাইলে পথশিশু নাহীদ বলেন, আমরা পথশিশু আমাদের বসবাস রাস্তার কুকুরের সাথেই। আমাদের লেখা পড়া কে করাবে? ঠিক মতো খেতেই পাইনা আবার লেখা পড়া! কতো মানুষের লাথি-উস্টা খেয়ে আমাদের বেঁচে থাকতে হয়। চাঁদপুর জেলার মধ্য মদনা এলাকার আব্দুল হালিমের ছেলে সোহাগ(১০) নামে এক পথশিশুর সাথে কথা হলে জানা যায়, তার মা জীবিত ছিলো যখন তখন সে ২য় শ্রেণী পর্যন্ত লেখা-পড়া করেছে। তারপর আর কখনো স্কুলে যেতে পারে নাই। মা মারা যাওয়ার পর থেকে সে বাবার কাছে বোঝা হয়ে গিয়েছিলো তাই তাকে নানীর বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। নানীর বাড়িতেও ঠিক মতো খেতে পারে নাই। বিছানায় প্র¯্রাব করে দেয় বলে তাদের কাছেও ঠিক মতো থাকতে পারে নাই সোহাগ। সোহাগ এখন ভূলতা ফ্লাইওভারের নিচে থাকে। তাদের মতো ১১ বছর বয়সী এমদাদ হোসেনের সাথে কথা হলে জানা যায়, তার মা নেই বাবা অসুস্থ । তার আর এক ভাই এক বোন রয়েছে। বোন মরিয়ম(৭),ছোট ভাই আলিফ(৫)। গত ৫ বছর আগে তার মা মারা যায়। বাবা আসাবুল(৪৭) আগে ভ্যানগাড়ি চালাতেন। গত দুই বছর আগে পায়ে আঘাত লাগে তার পর থেকে তার বাবার পা পঁচে যায়। তাই তার বাবা কোনো কাজ করতে পারে না। টাকার অভাবে চিকিৎসাও করাতে পারেন না। তারা মানুষের বাড়ি থেকে ভাত চেয়ে এনে খায়। আর রাত হলে গোলাকান্দাইল হাটে শুয়ে থাকে। বর্তমানে তাদের থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। এমদাদ প্রতিদিন ভোরে মাছের আড়তে মাছ টোকায়। তা বিক্রি করে নিজেরই হয় না। আবার ভাই-বোন বাবার চিকিৎসা। অনেক কষ্টে কাটছে তাদের দিন। এমন অবস্থায় কাটছে আরও অনেক মানুষের জীবন। নেই তাদের দেখার মতো কোনো স্বজন। রাস্তায় বের হলেই দেখা যায় এমন হাজারও চিত্র।