সোনারগাঁওয়ে বিলুপ্তির পথে গুনার তাঁত

79

তানজিলা: মসলিন ও জামদানির মতো হারিয়ে যেতে বসেছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের গুনার তাঁত। এখন আর আগের মতো এ গুনার তাঁত নেই। সোনারগাঁও থেকে মসলিন বিলুপ্ত হলেও সেই তাঁতের আদলেই তৈরি হয় গুনার (তারের) তৈরি জাল। আজ কোন রকম টিকে রয়েছে এ শিল্পটি। সোনারগাঁওয়ের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠা পরিবেশ বান্ধব এই তারের (জাল) তাঁত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ না করলেও আপন মনেই জীবিকার তাগিদে জাল বুনে যাচ্ছেন কারিগররা। তাঁরা টিকিয়ে রেখেছে এ শিল্পটি। গুনার (তার) জাল একটি ক্ষুদ্র শিল্প।

ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে পরিচিত এ ব্যবসা এক সময়ে সোনারগাঁওয়ের প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই থাকলেও বর্তমানে সোনারগাঁওয়ে কয়েকটি গ্রামে কারখানা রয়েছে। তাছাড়া করোনায় অনেক তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। মজুরী খুব একটা বেশি না পেলেও তারের জাল বুনেই খেয়ে-পড়ে সন্তুষ্ট সংশ্লিষ্ট কারিগর। তবে চাহিদা মতো সহজ শর্তে ঋণ পেলে এ শিল্প আরো বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন অনেকে।

জানা যায়, উপজেলার সোনারগাঁও পৌরসভার খাসনগর দিঘীরপাড়, ইছাপাড়া, দরপত, উত্তর ষোলপাড়া, মোগরাপাড়া ইউনিয়নের কাবিলগঞ্জ, ভাগলপুর, ছোট সাদিপুরসহ সাদীপুর, জামপুর, নোয়াগাঁও, কাঁচপুর, বারদী ইউনিয়নের কিছু এলাকায় গুনার (তার) তাঁত চালিয়ে সচ্ছল হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

সোনারগাঁও পৌরসভার দরপত গ্রামের মাহফুল রহমান কাউসার, শাহজালাল, মো. আনোয়ার, হানিফ, শাহ কামাল, জসিম, মো. জাকির, আকতার, কামাল, অর্জুন্দী গ্রামের চানু মোল্লা, উত্তর ষোল্লপাড়া গ্রামের আলমগীর হোসেন, মোগরাপাড়া ইউনিয়নের ভাগলপুর গ্রামের মামুন, দীঘিরপাড় গ্রামের অনেকেই দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে তারা এ ব্যবসার সাথে জড়িত। কেউ দাদার সুবাদে কেউ বাবার, আবার অনেকে নিজের ইচ্ছায়ই এ ব্যবসায় মনোনিবেশ করেছেন।

 অন্যান্য ব্যবসা করতে গেলে মোটা অংকের অর্থ ও লোকবলের প্রয়োজন বলে জানান সাংবাদিক তানজিলাকে। তাছাড়া লোকসানের সম্ভাবনাও থাকে। আর এই গুনা’র তাঁতে তেমন একটা অর্থ ও লোকবলের প্রয়োজন হয় না। মাত্র দু’জন কারিগরেই সপ্তাহে ৫০/১০০ ফুটের ১০-১২টি রোল নামাতে পারে। তবে বর্তমানে করোনা মহামারি কালে এ ব্যবসার অবস্থা এখন খারাপ যাচ্ছে। অনেক তাঁত বন্ধ রয়েছে।

তারের জাল তৈরির কারিগর মাইনুদ্দিন, খোরশেদ আলম, আলী, আজিজুল, কামাল হেসেনসহ আরো অনেকে জানান, বেশ কয়েক বছর যাবত কারিগর হিসেবে কাজ করছেন তারা। একটি ১শ’ ফুটের জাল (নেট) তৈরি করতে সময় লাগে শ্রেনীভেদে দুই থেকে তিন দিন। প্রতি সপ্তাহে ১০-১২টি করে রোল (৫০ ফুটে এক রোল) নামানো যায়। কারিগররা মজুরী পান জাল তৈরি হিসেবে। সর্বনিম্ন ৩৫০ থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকা পর্যন্ত রয়েছে প্রতিটি জাল তৈরির কারিগর মজুরি। এর মধ্যে আবার কারিগরদেরই যোগালির মজুরি দিতে হয়। যোগালী হিসেবে অনেক মহিলারা কাজ করেন। গড় হিসেবে সব মিলিয়ে প্রতি সপ্তাহে একজন কারিগর শ্রমের মজুরি পেয়ে থাকেন দু’ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। সে টাকা থেকেই বেতন দিয়ে রাখতে হয় যোগালিদের। যদি কারিগরদের সাথে যোগালি থাকে তাহলে দ্রুত জাল বোনা সম্ভব। আর একা করলে সময় লাগে দ্বিগুণ। যোগালিরা কোলের রোলার থেকে মাথার (অপর প্রান্তের) রোলার পর্যন্ত গুনা (তার) টেনে সংযোগ করে, চড়কি থেকে মাক্কুতে গুনা (তার) ভরে দেয় ও ঝাঁপ (পায়ের নীচের দু’টো বাঁশ উঁচু-নীচু করে) মারে। আর কারিগররা মাক্কু মেরে নিপুণ হাতে সূক্ষভাবে জাল তৈরি করেন।

কারিগরা আরো জানান, বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির কারণে আগের মত এখন কাজ কম। তারের ব্যবসার নাজুক হাল। কোন রকম টিকে আছে এ ক্ষুদ্র ব্যবসাটি। তারা জানান, কাজের টাকা দিয়ে খুব বেশি কিছু করতে না পারলেও খেয়ে-পড়েই সন্তুষ্ট তারা।

তাঁত মালিক চানু মোল্লা নিজের তাঁতে কাজ করতে করতে জানান, প্রায় ৭/৮ বছর যাবত এ পেশায় নিয়োজিত তিনি। আগে এটি শশুর করতে। এখন তিনি এ ব্যবসা করেন। তিনি বলেন, করোনায় অনেক সর্বনাশ করে দিয়েছে। তার দু’টি তাঁত রয়েছে। বর্তমানে একটি বন্ধ রয়েছে। কারিগর নেই। কাজ কাম কম। স্থানীয় কাবিলগঞ্জ থেকে গুনা (তার) কিনে জাল বুনছেন তারা। যখন যেমন অর্ডার পান সে হিসেবে বিভিন্ন মাপের তার কিনে বিভিন্ন মাপের জাল বুনে বিক্রি করেন। দরপত গ্রামের জাল (গুনা) ব্যবসায়ী মাহফুল রহমান কাউসার জানান, তিনি তার বাপ দাদা থেকে এ ব্যবসায় জড়িত। দরপত গ্রামে প্রায় ২শ’ গুনার তাঁত রয়েছে। করোনায় অনেক তাঁত বন্ধ রয়েছে।

তিনি আরো জানান, আগে ১০০ ফুটের একটি রোল বিক্রি হকো ৩-৪ হাজার টাকা। আর এখন কমে দু থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি হয়। গুনার(তারের) জাল বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হয়। ঘরের জানালা, খাবার রাখার সেলফ, কন্সট্রাকশনের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার, মাছের খাঁচা, চিংড়ি গেরসহ অনেক কাজে লাগে এই জাল। বর্তমানে মাছ চাষের পুকুরে নেটিং করার সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়। বর্তমান সময়ে দেশে ব্যাপকহারে মাছের চাষ করা হচ্ছে। মাছ চাষের সময় অনেক ক্ষেত্রে নেটিং করার প্রয়োজন পড়ে। তাই এর ব্যবহার  বেশি। আগে এই জাল তৈরির পর বিভিন্ন রকমের রং করে বিক্রি করা হতো। বর্তমানে আর হাতে রং করতে হয় না। চাহিদা মতো দানা (প্লাস্টিক)’র লেমিনেশন করা তার কিনতে পাওয়া যায় বিধায় সহজেই তা এনে জাল বোনা যায়। ঢাকা, নরসিংদী, কুমিল্লা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা সোনারগাঁও থেকে অর্ডার দিয়ে বানিয়ে নিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করছেন এই জাল। এ তাঁত ব্যবসা করে সোনারগাঁওয়ে অনেক ব্যবসায়ী সচ্ছল হয়েছেন। ব্যবসায়ীরা যদি সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পাওয়া যেত তাহলে পরিবেশ বান্ধব এ ব্যবসায় বিপ্লব ঘটানো সম্ভব ছিল বলে জানান ব্যবসায়ীরা।